• ঢাকা,বাংলাদেশ
  • মঙ্গলবার | ২০শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | গ্রীষ্মকাল | সকাল ৯:৩৯
  • আর্কাইভ

রায়পুর পৌর নির্বাচন : গোপন বুথে নৌকার এজেন্ট!

১:০০ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ০১, ২০২১

রায়পুর পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের একটি মহিলা ভোট কক্ষের গোপন বুথে ঢুকে পড়ে নৌকার এজেন্ট। ছবি- রায়পুর প্রতিনিধি

মো. নিজাম উদ্দিন : লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভা নির্বাচনে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রের ভেতরে নৌকার কর্মীরা অবৈধ অবস্থান নিতে পারলেও পেশাগত দায়িত্বে বৈধ অবস্থানে বাধার মুখে পড়েন সংবাদকর্মীরা। কেন্দ্রে কেন্দ্রে গোপন বুথে ঢুকে ভোটারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইভিএম এ বোতাম চেপে দেওয়ার একাধিক অভিযোগও পাওয়া গেছে ওইসব অবৈধ অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে।

তাসত্ত্বেও বহিরাগত অবৈধ অবস্থানকারীদের সরাতে দিনব্যাপী কেন্দ্রগুলোতে বেশীরভাগক্ষেত্রে প্রশাসন এর দায়িত্বশীলরা নির্লিপ্ত রয়েছেন বলেও ভোটারদের অভিযোগে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতেই সম্পন্ন হয় লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভা নির্বাচন।

ভোট গ্রহণ চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন কেন্দ্র পরির্দশন করে সাধারণ ভোটারদের কাছ থেকে অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া গোপন বুথে নৌকার এজেন্টদের প্রভাববিস্তারের এসব ঘটনায় ভোটারদের মাঝে সৃষ্ট অসন্তোষ এর কারনে একাধিক কেন্দ্রে হাতাহাতি ও মারামারির খবরও পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে ঘুরে নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোতে ধানের শীষের প্রতীকের এজেন্টদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়নি। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা জানায়, আগের রাতে সরকারদলীয় প্রার্থীর লোকজনের পক্ষ থেকে প্রাণনাশের হুমকি-ধমকীর কারনে আতংকগ্রস্থ এজেন্টরা কেন্দ্রে যাওয়ার সাহস পায়নি।

তবে, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসাররা বলছেন, এ বিষয়ে কেউ কোন লিখিত অভিযোগ দেয়নি।

ভোট চলাকালীন কোন কোন কেন্দ্রে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশে প্রিজাইডিং অফিসারের বাধার মূখে পড়তে হয়েছে।

সংবাদিকদের কাছে পর্যবেক্ষণের কার্ড থাকা সত্ত্বেও পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের কেরোয়া সিরাজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে তাদের প্রবেশ করতে দেননি ওই কেন্দ্রে দায়িত্বরত জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

এদিকে, সকাল থেকে কেন্দ্রের আশপাশ এলাকাগুলো এবং ভোট গ্রহণ কক্ষের ভেতরেও আওয়ামীলীগ দলীয় নেতাকর্মী এবং বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি অবস্থান নিয়ে কেন্দ্রের ভেতরে এবং বাহিরে অবৈধ প্রভাব বিস্তার করতে দেখা গেছে।

সকাল ৮টা ১০ মিনিটের দিকে পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের মধুপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র গিয়ে দেখা যায়, এ কেন্দ্রে তখনো ভোট গ্রহণ শুরু হয়নি। ইভিএম মেশিনের কারণে সেখানে ভোটগ্রহণ শুরু দেরী হচ্ছে বলে জানান দায়িত্বরত প্রিজাইজিং কর্মকর্তা মো. শরীফ। ভোট কক্ষের ভেতরের ছবি ধারণ না করতে সাংবাদিকদের নিষেধ করেন তিনি। এ কেন্দ্রের গোপন বুথে নৌকার এজেন্টদের ঢুকে ভোটারদের প্রভাবিত করতে দেখা গেছে। সাড়ে ৮টার পর ওই ওয়ার্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে হট্টগোল দেখা দেয়।

তারা অভিযোগ করেন, নৌকার এজেন্টরা গোপন বুথে গিয়ে মেয়র পদের ব্যালট মেশিনের বোতাম চেপে দেওয়ার সময় পছন্দের কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রতীকেও বোতাম চেপে দেন। এ সময় তারা উপস্থিত আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের কাছে মেয়র পদের ভোট সম্মূখ্যে গ্রহণ এবং কাউন্সিলর পদের ভোট গোপনে গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কেন্দ্রে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। সাবেক এক জেলা ছাত্রলীগ নেতা ও সদর উপজেলার আওয়ামীলীগ দলীয় এক ইউপি চেয়ারম্যানকে এ কেন্দ্রের বাহিরে অবস্থান নিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে দেখা গেছে।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ৩নং ওয়ার্ডের স্টেশন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ নং ভোট কেন্দ্রের ৫ নং পুরুষ কক্ষে গিয়ে গোপন বুথে পাশে নৌকার একজন এজেন্ট সার্বক্ষণিক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ওই কক্ষে এক ব্যক্তি প্রবেশ করে নৌকার আরেকজন এজেন্টের সাথে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। পরে দায়িত্বরত প্রিজাইডিং কর্মকর্তা আবদুস সাত্তার গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

এ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটাররা অভিযোগ করে বলেন, কোন ভোটার মেয়র পদে নিজেদের পছন্দ্রের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারছেন না। নৌকার এজেন্টরা ভোটিং মেশিনে বোতাম চেপে দিচ্ছেন। এ জন্য একজন ভোটার ক্ষিপ্ত হয়ে বাহির থেকে প্রবেশ করে নৌকার এজেন্টকে মারধর করেছেন। অভিযোগের বিষয়ে দায়িত্বরত প্রিজাইডিং কর্মকর্তা বলেন, আমি যতটুকু সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করি।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ৪ নং ওয়ার্ডের রায়পুর মর্চ্চেন্টস সরকারী একাডেমী কেন্দ্রের মহিলা বুথে গিয়ে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক ও সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতাকে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। সেখানে একজন নারী ভোটার ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবাদ জানায়।

তিনি অভিযোগ করেন বলেন, আমার আঙ্গুলের চাপ শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে নৌকার এজেন্ট মেয়র পদের ভোটটি দিয়ে দিয়েছেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই কেন্দ্রের এক পুরুষ ভোটার ভোট দিতে গেলে তার ভোটটিও নৌকার এজেন্ট দিয়ে দেয়। এতে তিনিও প্রতিবাদ করলে হামলার শিকার হন। উপস্থিত নৌকার কর্মীরা তাকে মারধর করেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি শান্ত করেন। এ সময় বেশ কয়েকজন ভোটার ভোট না দিয়ে কেন্দ্র থেকে ফেরৎ গেছেন। তাদের অভিযোগ ছিলো, নিজেদের পছন্দ্রের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করার পরিবেশ নেই।

কেন্দ্রের দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসার রাকিব হাসান জানান, সাময়িক বিশৃঙ্খলা হয়েছে। ফোর্স সঙ্কটের কারনে নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হচ্ছে। এসব ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি।

দুপুর ১২টার দিকে ৮নং ওয়ার্ডের রায়পুর সরকারী কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানেও গোপন বুথের ভেতর নৌকার এজেন্টদের অবাধে প্রবেশ করতে দেখা যায়। ভোটারদের আঙ্গুলের চাপ শনাক্ত হওয়ার পর পরই মেয়র পদের ব্যলাট মেশিনে ভোটটি এজেন্টরা দিয়ে দিচ্ছেন বলে কয়েকজন জানিয়েছেন।

ভোট কেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকে দুপুর ১২টার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও দুপুরের পর ভোটারদের উপস্থিতি তেমন একটা চোখে পড়েনি।

লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ নাজিম উদ্দীন গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেছেন, ‘অনিয়মের কোনো অভিযোগ কোনো প্রার্থী করেননি। শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হয়েছে।’

উল্লেখ্য, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতিতে রোববার রায়পুর পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ৮ হাজার ৪০২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী নৌকা প্রতীকের গিয়াস উদ্দিন রুবেল ভাট। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এবিএম জিলানী ধানের শীষ প্রতীকে ভোট পেয়েছেন এক হাজার ৪৪১ ভোট। নির্বাচনে আরও চারজন প্রার্থী মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে তারা জামানত হারিয়েছেন। কাউন্সিল পদে প্রার্থী হয়েছেন ৫১ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিল পদে প্রার্থী হয়েছেন ৬ জন। ৯টি ওয়ার্ডের ১৩টি ভোট কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ২৩ হাজার ৬৩১ জন।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ



Design & Developed by Md Abdur Rashid, Mobile: 01720541362, Email:arashid882003@gmail.com