• ঢাকা,বাংলাদেশ
  • শুক্রবার | ২২শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | শীতকাল | রাত ৮:৫৩
  • আর্কাইভ

উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি চর রমনীমোহনে, আখের গোছাতে ব্যস্ত জনপ্রতিনিধিরা

১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ, জুলা ০৮, ২০২০

মো. নিজাম উদ্দিন : মেঘনা নদীর উপকূলীয় এলাকা লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররমনী মোহন ইউনিয়ন। সাড়ে ১২ বর্গ কি. মি. আয়তনের এ ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ৪২ হাজারের বেশি। ইউনিয়নের বেশিরভাগই ভূমি আবাদি জমি এবং নদী এলাকা। মৎস্য এবং কৃষির উপর নির্ভরশীল এ এলাকার জনগণ।

চরাঞ্চল বেষ্টিত হওয়ায় এলাকার বেশিরভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মান একেবারে অনুন্নত। পিছিয়ে আছে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে। এ এলাকার শিক্ষিতের হার মাত্র ১৫ শতাংশ। যদিও প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ইউনিয়নটিতে।

পিছিয়ে থাকা এ জনগোষ্টির বাসিন্দাদের ৬০ ভাগ স্যানিটেশনের আওতায়। এলাকায় রয়েছে অসংখ্য গ্রামীন সড়ক। বর্ষা মৌসুমে বেশিরভাগই চলাচলের অনুগোযোগী। একটি ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধ থাকলেও সেটি বিধ্বস্ত হয়ে আছে কয়েক বছর থেকে। সংস্কারের অভাবে বাঁধটি চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বাঁধটির দিকে নজর নেই কোন জনপ্রতিনিধি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

বলতে গেলে আধুনিক এ যুগে পুরোপুরি পিছিয়ে রয়েছে এ এলাকার মানুষ। ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্থান মজুচৌধুরীরহাট। জেলার সদর উপজেলার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল এটি। রয়েছে লঞ্চঘাট, ফেরীঘাট, মাছঘাট, স্লুইচগেট এবং বালু মহাল। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলীয় পণ্যসামগ্রী আসা যাওয়া করে মজুচৌধুরীরহাট দিয়ে। পণ্যের পাশাপাশি ঢাকা-চট্রগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলীয় লোকজনের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ রুট এটি। নো-বন্দর হিসেবেও এ এলাকাটিকে ঘোষণা করেছে সরকার। যদিও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

কিন্তু এতো কিছু থাকতেও কেন এ অঞ্চলের বাসিন্দারের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি? কি করছেন তাদের প্রতিনিধিরা? সেগুলো খোঁজ করে তুলে আনার চেষ্টা করেছে কালের প্রবাহ।

প্রত্যেক এলাকার লোকজনের প্রতিনিধিত্ব করে তাদের জনপ্রতিনিধি। স্থানীয় প্রশাসন বা সরকারের কাছ থেকে এলাকার উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নিয়ে থাকে জনপ্রতিনিধিরা। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে তাদের। কিন্তু এ এলাকার জনপ্রতিধিরা সব সময় জড়িত থাকে বিতর্কিত কর্মকান্ডে।
এলাকাটি ভৌগলিক দিক দিয়ে সদর উপজেলার হলেও সংসদীয় আসনটি হলো লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর-সদর আংশিক) আসন। পূর্বে এ আসনটি ছিলো বিএনপির দখলে।

১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এ আসনে প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যদিও সরকার গঠনের পর এ আসনটি চেড়ে দিয়ে উপনির্বাচন দেয়া হয় সেখানে। কিন্তু তৎকালীন সরকার প্রধান নির্বাচিত হলেও এলাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। পবরর্তীতে গেল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মজুচৌধুরীর হাট থেকে ভোলা-বরিশাল রুটে ফেরীঘাট চালু করা হয়।

২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে এ এলাকার যিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি জাতীয় পার্টির নেতা মোহাম্মদ নোমান। বলতে গেলে সাবেক ওই সংসদ সদস্যের বাড়ির পাশের ইউনিয়ন এটি। তিনি কি সুদৃষ্টি দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ এ ইউনিয়টিতে?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহাজোট থেকে প্রার্থী হওয়া জাতীয় পার্টির নেতা মোহাম্মাদ নোমান সংসদ সদস্য থাকাকালে চররমনী মোহনের যেটুকু উন্নয়ন করেছেন তা ছিলো গতানুগতিক। বিতর্কিত এ সাংসদ গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটির উন্নয়নে তেমন কোন ভূমিকা রাখেননি।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারী বরাদ্দগুলো দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে করাতেন তিনি। ফলে উন্নয়ন কাজের বেশিরভাগ অর্থ লোপাট হয়ে যেত। আসনটি সদর অংশে সাংসদের যে প্রতিনিধি প্রতিনিধিত্ব করতো ওই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিলো।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল। বিতর্কিত এ এমপি এখন কুয়েতের কারাগারে বন্দি আছেন। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে মহাজোটের প্রার্থী মোহাম্মদ নোমানকে মাঠ থেকে সরিয়ে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন।

পাপুলের বিষয়ে কথা হয় এলাকার জনগণের সাথে। বলছেন, এমপি হওয়ার পর থেকে তিনি চররমনীমেহনে একবার এসেছেন হেলিকপ্টারযোগে। যদিও সেটা বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। মূলত এলাকার মানুষের কথা ভেবে তিনি এ এলাকায় একবারও আসেন নি।

কিন্তু নির্বাচনের আগে এলাকাবাসীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কি ছিলো? এমন প্রশ্ন ছিলো এলাকাবাসীর প্রতি। তারা জানালেন, কাজী পাপুল যখন স্বতন্ত্র হয়ে প্রার্থী হয়ে ভোট খুঁজতেছেন, তখন পাপুলের মেয়ে তার পক্ষে ভোট চাইতে মজুচৌধুরীর হাট এলাকায় আসেন। তাঁর মেয়ে এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান।

একই সাথে বেকারদের চাকরীর ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন এমপি কন্যা। নির্বাচন পূর্ব আয়োজিত সমাবেশে পিতার সম্পদের বিবরণ তুলে ধরেন কন্যা। অস্থায়ীভাবে বেড়ির পাশে বসবাসরত গৃহহীনদের বাসস্থানের আশ্বাস দিয়ে যান তিনি।

কিন্তু কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি। এমন প্রশ্ন ছিলো সাবেক এক ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতার কাছে। তিনি বলেন, ‘এমপি কন্যা শুধু আশ^স্ত করে গেছেন, কিন্তু কোনটা বাস্তবায়নের কথা শোনা যায়নি। আর এখনতো তিনি জেলে। নিজেকে নিয়েই টানাটানি। আমাদের ভাগ্য খারাপ। জনগণের জন্য কাজ করবে এমন কোন সংসদ সদস্য আমরা পাইনি। এলাকার জনগেণের জীবন ব্যবস্থা অনুন্নতই রয়ে গেছে।’

বলেন, ‘এ এলাকার অধিকাংশ লোকজন জেলে এবং কৃষক। এদের আনেকেরই নিজস্ব কোন ভূমি নেই। সরকারী বেড়ির পাশে অস্থায়ীভাবে ঘর নির্মাণ করে বসবাস করেন তারা। বেশিরভাগ লোকজন অশিক্ষিত। সচেতনতার অভাবে তাদের সন্তানরাও শিক্ষা থেকে দূরে আছে। ছেলে সন্তান একটু বড় হলেই নদীতে মাছ শিকার বা মাঠে কৃষি কাজে নেমে পড়ে। আর মেয়ে হলে অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেশি এখানে।’

এলাকার বেশিরভাগ লোকজনের কাছে প্রশ্ন ছিলো বর্তমান সংসদ সদস্য নিয়ে। কি ভাবছেন তারা এমপি পাপুলকে নিয়ে?

‘‘পাপুল আমাদের এমপি ছিলো। কিন্তু তাকে আমরা কখনো দেখিনি। নির্বাচনের পর এ ইউনিয়নে দুই বার এসেছে। তবে ভোটের আগের এক এসে কিছু কাপড় বিলি করে গেছেন। এছাড়া তাঁর কিছু প্রতিনিধি আসতো। তারা প্রচার প্রচারণা চালাতো। যখন মহাজোট প্রার্থী মোহাম্মদ নোমান সরে গেছে, তখন তাঁর পক্ষে আওয়ামীলীগ নেতারা মাঠে কাজ করতে শুরু করেছে। কিন্তু নির্বাচনের পর এলাকার উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ড তেমন একটা হয়নি। যা হয়েছে সেগুলো স্বাভাবিক নিয়মে হয়েছে।’’ -বললেন মধ্য চররমনী গ্রামের এক বাসিন্দা।

ওই গ্রামের মাতাব্বর হাটের আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘‘শুনেছি এমপি পাপুল বিদেশের কারাগারে আটকে আছেন। তিনি নিশ্চয় অপরাধ করেছেন। বিদেশে তো আর বিনা অপরাধে কাউকে জেলে রাখে না। তিনি আমাদের এমপি- এ পরিচয় দিতেই লজ্জা লাগে। যেভাবে তিনি ঢাক-ঢোল পিটিছেন, তাতে তো তাকে বিরাট সৎ মনে হয়েছে। আসলেতো তিনি অসৎ লোক ছিলেন। শুনতেছি মানুষ পাচার করার জন্য তাকে আটক করেছে। তিনি যদি অপরাধ করে থাকেন তাহলে অবশ্যই যেন তার বিচার হয়।’’

ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেন,‘ এমপি যখন দেশে ছিলো, আমাদের কোন খোঁজ নেননি। আমাদের এলাকা অনুন্নত। এলাকার রাস্তাঘাটের অবস্থা একদম খারাপ। মানুষ এখনো সাঁকো দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করছে। তিনি তো নির্বাচনের আগে আমাদের অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু কোনটার বাস্তবায়ন হয়নি।’’

তিনি বলেন, ‘এ এলাকার বেশিরভাগ মানুষ ভূমিহীন। লক্ষ্মীপুরসহ ভোলা-বরিশালের নদী ভাঙা মানুষগুলো এ এলাকার বেড়িবাঁধের পাশে অস্থায়ীভাবে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এদের মধ্যে অনেকে হয়তো এ এলাকার ভোটার নয়। আবার কেউ কেউ ভোটারও। কিন্তু জনপ্রতিনিধিনের কাছ থেকে তাদের জন্য তেমন কোন সাহায্য বা সহযোগীতা আসে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ এলাকার অনেক মানুষ নিন্ম আয়ের। করোনাকালীন লকডাউনের সময় মানুষ খুব কষ্টে দিন যাপন করছে। শুধুমাত্র রমজান মাসে এমপি পাপুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম একবার এ এলাকাতে এসে গুটি কয়েক মানুষকে ত্রাণ দিয়ে চলে গেছেন। আর কোন খবর রাখেন নি।’’

ইউনিয়নের চর আলীহাসান গ্রামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘‘এমপি কন, চেয়ারম্যান-মেম্বার কন (বলেন)- কোন জনপ্রতিনিধিই আমাদের উপকারে আসে না। তারা শুধু তাদের চিন্তায় আছেন। আমরা কাজ করি আর খাই। এ সব নিয়ে আমাদের কোন চিন্তা নেই।’’

কালের প্রবাহের চোখে চররমনী মোহনের বর্তমান অবস্থা:

৬ টি গ্রাম এবং ৬ টি মৌজা নিয়ে গঠিত চররমনী মোহন ইউনিয়ন। এক সময় এ ইউনিয়নটি টুমচর ইউনিয়নের অন্তভূক্ত ছিলো। পরে এটিকে আলাদা করা হয়। বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ রয়েছে ইউনিয়নটিতে। মজুচৌধুরীর হাটের পশ্চিমে মেঘনা নদী সংলগ্ন দ্বীপ চর মেঘাসহ ছোটবড় প্রায় ৫টি চর। এক সময় ওইসব চরে অস্থায়ীভাবে লোকজন বসবাস করলেও এখন স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেছে। দ্বীপটি দখলে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে। নদীতে জেগে উঠা চরের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে স্থানীয় দুই প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি। চরে যারা চাষাবাদ বা গবাদি পশু পালন করছেন তাদেরকে বাৎসরিক হিসেবে টাকা দিতে ওই দুই দখলদারকে।

ইউনিয়নের নাভী বলা হয় ৫ নং ওয়ার্ডকে। গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল মজুচৌধুরীরহাট ওই ওয়ার্ডের অন্তভূক্ত। ফেরীঘাট ও লঞ্চঘাট সেখানেই অবস্থিত। ফেরীঘাট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার লোক এবং পণ্যবাহী যানবাহন যাতাযাত করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম জেলাগুলোতে। এছাড়া বরিশাল ও ভোলারুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করে এ ঘাট থেকে।

গুরুত্বপূর্ণ মাছঘাট রয়েছে সেখানে। মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার ইলিশ মাছ সহ সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হয় এ ঘাটে। ছোট-বড় ১৩ টির মতো আছে বালু মহাল। দক্ষিণাঞ্চল থেকে মৌসুমী ফলসহ, খাদ্য শশ্য এবং গবাদি পশু আসে এ ঘাট দিয়ে। কিন্তু অর্থনীতির প্রভাব কি পড়তেছে মজুচৌধুরীরহাটে? স্থানীয়ভাবে অর্থনৈতিক এ আঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? তার খোঁজও করেছে কালের প্রবাহ।

অর্থনৈতিক এ জোন নিয়ে স্থানীয় দুই জনপ্রতিনিধির মধ্যে চলমান দ্বন্ধে পিছিয়ে পড়েছে এলাকার উন্নয়ন। তারা দুইজন নিজেদের আখের গোঁছাতেই ব্যস্ত সময় পর করে। ফলে এলাকার উন্নয়নের তাদের কোন মাথাব্যথা নেই।

চর রমনী মোহন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ ছৈয়াল। আওয়ামীলীগের সমর্থন নিয়ে পর পর দুই বার তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে এ বিএনপি নেতা ভোল পাল্টে আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যান। খুব একটা ভালো ছিলো না তার অতীত ইতিহাস। ইউনিয়নের উত্তর চর রমনীমোহনে তার পৈত্রিক বাড়ি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় দস্যুতার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চর দখল, মাছঘাট নিয়ন্ত্রণ, জেলেদের নির্যাতন ছিলো প্রধান কাজ। যদিও এসব করতে গিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন করাতির হাটের আলী হোসেন কারতির পরিবারের সাথে। ২০০১ সালে উগ্রপন্থী এ দস্যু বাহিনীর হাতে খুন হয়েছে করাতির পরিবারের এক যুবক। খুনের পাল্টা প্রতিশোধ নেয় করাতির পরিবার। এক জনের বদলে তিনজনকে হত্যা করে তারা। তখন প্রতিপক্ষের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে চেয়ারম্যানের দুই ভাই ও এক আত্মীয়। বর্তমানে ওই দুই পক্ষের মধ্যে দৃশ্যমান দ্বন্ধ না থাকলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্দ একে অপরের প্রতি।

মেঘনা নদীতে জেগে ওঠা মেঘার চর, নব্বার চর, হেলালের চর ও কানবিগার চরসহ সবগুলো চরের অধিকাংশ এলাকা ইউপি চেয়ারম্যানের দখলে। স্থানীয়ভাবে চরগুলো নিয়ন্ত্রণ করে চেয়ারম্যানের ভাইয়ের ছেলেরা এবং প্রথম সংসারের সন্তানেরা। চরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালে মাছ শিকার করতে হলে জেলেদের বাৎসরিক হিসেবে চাঁদা দিতে হয় চেয়ারম্যানকে। যারা চাঁদা দিতে অস্বীকার করে তাদের মাছ ধরার নৌকা, জাল এবং মাছ কেড়ে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করে চেয়ারম্যানের অনুসারীরা।

একই ভাবে চরে গবাদি পশু পালন করতে হলে বাৎসরিক চাঁদা দিয়ে হয়। জানা গেছে, চরে প্রতি মহিষ বাবদ সিজনে একহাজার এবং গরু বাবদ ৫-৬ শ’ টাকা করে দিতে হয় চেয়ারম্যানের নিয়োজিত কর্মী বাহিনীকে। এ কাজের নেতৃত্ব দেন চেয়ারম্যানের এক ভাতিজা। চরের ভাড়া বাবদ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে চুরি হয়ে যায় তাদের গবাদি পশু। তবে এ সব কিছুর মুখ খোলার সাহস পাননা চরের সাধারণ লোকজন।

তাদের মতে, ‘জলে বাস করে কুমিরের সাথে দ্বন্ধ করতে নেই।’ যদিও সম্প্রতি জেলেদের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে চেয়ারম্যান ছৈয়াল ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুর আদালতে মামলা হয়েছে।

মেঘনা নদী সংলগ্ন খাল থেকে অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে প্রায় সময় বালু উত্তোলন করে চেয়ারম্যানের ভাই এবং আত্মীয়-স্বজনেরা। দূর্গম এলাকা হওয়ায় প্রশাসনের চোঁখ ফাঁকি বালু উত্তোলন করে জমি ভরাট করার কথা জানা গেছে।

জেলেদের চালে চেয়ারম্যানের থাবা :
এলাকার বেশিরভাগ জনগণ জেলে। নদীতে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ শিকার থেকে জেলেদের বিরত রাখতে সরকারী বিভিন্ন সহযোগীতা করা হয় তাদের। এ সময় খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয় জেলেদের। তালিকাভূক্ত জেলেরা এ সুবিধা পেয়ে থাকে। মাঠ পর্যায়ে তালিকা তৈরী করে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। কিন্তু চররমনী মোহনে তালিকা তৈরীতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নিজেদের পছন্দের জেলেদের তালিকা অন্তভূক্ত করার অভিযোগ রয়েছে এসব জনপ্রতিনিধিদের। এছাড়া জেলে না হয়েও তাদের আত্মীয়-স্বজেনেরা এসব সরকারী সুবিধা গ্রহণ করে বলে অভিযোগ প্রকৃত জেলেদের। আর প্রতিবারই জেলেদের চালে কম দেওয়ার অভিযোগ ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি জেলেদের জন্য বরাদ্ধকৃত বেশ কিছু চাল চেয়ারম্যানের দুই আত্মীয়ের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় প্রশাসন।

সরকারী বরাদ্ধে চেয়ারম্যানের পুকুর চুরি:
গুরুত্বপূর্ণ এ এলাকাটি অনুন্নত থাকার পেছনে রয়েছে সরকারী বরাদ্দে চেয়ারম্যানের নয়-ছয়। স্থানীয়ভাবে যে বরাদ্দগুলো আসে তার অধিকাংশ অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। চরে ভূমিহীনদের জন্য সরকারী অর্থায়নে নব-নির্মিত আশ্রয় কেন্দ্রের বালু ভরাটে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়। পরে আলোচিত এ ঘটনা ম্যানেজও করে ফেলেন তিনি।

গ্রামীন সড়ক উন্নয়নে নামমাত্র কাজ করান ইউপি চেয়ারম্যান। ফলে টেকসই কোন উন্নয়ন হচ্ছে না সেখানে। আর গ্রামীন বেহাল সড়কগুলোর প্রতিও নজর নেই তার। করোনাকালীন সময়ে এলাকার কর্মহীনদের প্রতি ছিলো না তার দায়িত্ববোধ। এছাড়া করোনায় জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর কোন প্রদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি তাকে। উল্টো জনসমাগম করে ঘাট দখল করে করোনা ঝুঁকি সৃষ্টি করেছেন তিনি।

ঘাট দখলের দ্বন্ধ :
এলাকার তার প্রধান প্রতিপক্ষ আরেক জনপ্রতিনিধি মো. আলমগীর হোসেন। বর্তমানে তিনি জেলা পরিষদের সদস্য। এর আগে ইউনিয়ণ পরিষদের সদস্য (মেম্বার) ছিলেন তিনি। মজুচৌধুরীরহাটের ঘাট এবং চরের জমি দখল নিয়ে এ দুই জনপ্রতিনিধির দ্বন্ধ চরম আকার ধারণ করেছে। এছাড়া রাজনৈতিক পদের জন্যও লড়াই করছেন দু’জনে। এ সব ঘটনায় দুই জনের সমর্থকদের মধ্যে প্রায় হামলা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

গত ১ জুলাই মজুচৌধুরীর হাটের ঘাটের দখল নেন ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ ছৈয়াল। চলতি অর্থ বছরে জেলা পরিষদ থেকে তার আত্মীয়ের নামে ঘাটের ইজারা নেন তিনি। দীর্ঘ ১০ থেকে ১২ বছর ঘাটটি আলমগীর মেম্বারের দখলে ছিলো। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে তিনি ঘাটটি তার দখলে রেখেছেন। এ দুই জনপ্রতিনিধির মধ্যে দলীয় পদ নিয়েও দ্বন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে। ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি প্রার্থী তারা দুইজন। চলতি বছরের শুরুতে আওয়ামীলীগের কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও সেটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে ঝুলে আছে নতুন কমিটি হওয়ার বিষয়টি।

তাদের দুইজনের রাজনৈতিক মতাদর্শ এক হলেও ব্যক্তি দ্বন্ধের কারণে স্থানীয় আওয়ামীলীগের মধ্যে আন্ত:কোন্দল লেগে আছে। দুই জনের রয়েছে পৃথক পৃথক কর্মী সমর্থক ও বাহিনী।

জেলে থেকে সম্পদশালী আলমগীর মেম্বার :
চররমনী মোহনে প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর মেম্বার। বর্তমানে অগাধ সম্পদশালী এ ব্যক্তি এক সময় ছিলেন মাছ ধরার জেলে। খুব বেশি আগের কথা নয়, কয়েক যুগ আগে অন্য জেলা থেকে লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাটে আসেন আলমগীর মেম্বারের পিতা নুরুল হক মিয়া। আশ্রয় নেন ইউনিয়নের মাতাব্বরহাট এলাকায়। নদীতে মাছ শিকার ছিলো আলমগীর মেম্বারের পেশা। অল্প সময়ের মধ্যে অর্থের মালিক হয়ে যান তিনি। দাদন দেওয়া শুরু করেন জেলেদের। হয়ে যান মহাজন। তবে তাতে হয়তো পরিবারে স্বচ্চলতা আসে। কিন্তু কিভাবে মালিক হলেন অগাধ সম্পদের মালিক?

জানা গেছে, ১০-১২ অর্থনৈতিক অঞ্চল মজুচৌধুীরর হাটের ঘাট দখলে নেন আলমগীর মেম্বার। প্রথমে লীজ নিলেও পরবর্তীতে আইনের ফাঁক-ফোকর বের করে গত অর্থ বছর পর্যন্ত ঘাটটি দখলে নেন তিনি। সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করে তিনি গড়তে থাকেন টাকার পাহাড়। সড়কে টোলের নামে শুরু করেন চাঁদাবাজি। মজুচৌধুরীরহাট রুটে চলাচলকৃত পণ্যবাহী সকল যানবাহন থেকে চাঁদা তুলতো তার লোকেরা।

এক সময় রহমতখালী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, রহমতখালীর স্লুইজগেট সংলগ্ন এলাকাতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে তিনি কয়েক কোটি টাকার বালু উত্তোলন করেছেন। এছাড়া মেঘার চরে তার দখলে রয়েছে কয়েক শ’ একর জমি। অবৈধভাবে দখলে রেখে সেগুলোতে গরু-মহিষের খামার চালু করেছেন তিনি।

মূলত চর রমনী মোহনে এ দুই প্রভাবশালীন দ্বন্ধে এলাকাবাসী উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। নিজেদের আখের গোঁছাতে ব্যস্ত থাকা জনপ্রতিনিধিরা এলাকার সাধারণ জনগণকেও নিজেদের প্রয়োজনে জিম্মি করে রেখেছেন। দিনের পর দিন নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটলেও এলাকার জেলে এবং কৃষকরা দু’ মুঠো ভাত জোগাড় করতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ সব অবহেলিত বাসিন্দাদের সন্তানেরা শিক্ষা-দীক্ষায় বা সামাজিক দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়েছে। তাই এলাকায় আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রয়োজন স্বচ্চ প্রতিনিধির।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ



Design & Developed by Md Abdur Rashid, Mobile: 01720541362, Email:arashid882003@gmail.com