• ঢাকা,বাংলাদেশ
  • মঙ্গলবার | ২০শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | গ্রীষ্মকাল | সকাল ৯:২৯
  • আর্কাইভ

ইটভাটায় অবাধে বিক্রি হচ্ছে শিশুশ্রম

৯:১৩ অপরাহ্ণ, জানু ০৯, ২০২১

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার তেওয়ারীগঞ্জের সংসার ইটভাটায় কর্মরত শিশু শ্রমিক ফয়সাল

মো. নিজাম উদ্দিন : ১০ বছরের ফয়সাল কাজ করছে ইটভাটায়। প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তাকে ইট তৈরীর কাজ করতে হয়। এর মধ্যে শুধু দুপুরে এক ঘন্টা খাবার বিরতি। নেই কোন সপ্তাহিক ছুটি। দীর্ঘ ৬ মাস তাকে ভাটা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হবে। তার পিতা ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ৬ মাসের জন্য ইটভাটাতে বিক্রি করে দিয়েছেন তাকে।

এরই মধ্যে আড়াই মাস পার হয়েছে। বাকী সাড়ে তিন মাস পার হলে বাড়ি ফিরতে পারবে। ৫০ হাজার টাকার বাহিরেও সপ্তাহে দুই শ’ টাকা করে দেয় তার সর্দার। সেটা দিয়ে চা-নাস্তার খরচ চলে, আর থাকা-খাওয়া ইট ভাটাতেই। জেলার সদর উপজেলার তেওয়ারীগঞ্জ ইউনিয়নের চর মনসা গ্রামের ‘সংসার ব্রিক্স’ নামক একটি বাংলা ইটভাটাতে তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখা গেছে।

ফয়সাল জানায়, তার বাড়ি চট্রগ্রামের স্বন্দীপে। বাবা শাহ আলম কাজ করেন কাঠ মেস্তুরীর। ৪ ভাই-বোনের সংসারে ভাইদের মধ্যে সে বড়। ফলে অভাবের সংসারে একটু অর্থের যোগান দিতে শিশুকালকে বিসর্জন দিয়ে ইটভাটার মতো কঠিন একটি জায়গায় কাজ শুরু করেছে। এটাই তার জীবনের প্রথম কর্ম। এর আগে ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত লেখা-পড়া করে ফয়সাল।

সে আরও জানায়, চাচা জসিম উদ্দিন ইটভাটার মাঝি। বিভিন্নস্থানে শ্রমিক সরবরাহ করে। চাচার মাধ্যমে তার বাবা সংসার ব্রিক্স নামক ইটভাটা থেকে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম নিয়ে তাকে বিক্রি করে দিয়েছেন। ওই টাকা দিয়ে তাদের জমি কেনা হয়েছে। ফয়সালের মতো ওই ভাটাতে কাজ করছে ইউসুফ নামের আরেক শ্রমিক। তার গল্পটা ভিন্ন হলেও পরিবারের অভাবের তাড়নায় শিশু বয়সে ইটভাটার কঠোর কাজ করতে হচ্ছে তাকেও।

শুধু ফয়সাল বা ইউসুফ নয়, তাদের মতো বিভিন্ন বয়সের শিশুরা বিভিন্ন ইটভাটাতে শিশু শ্রমিক হিসেবে বিক্রি হয়ে গেছে। শনিবার সদর উপজেলার তেওয়ারীগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, লাহারকান্দি এলাকার বেশ কয়েকটি ইটভাটাতে ঘুরে শিশু শ্রমিকদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে দেখা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভাটায় কর্মরত একজন পূর্ণ বয়স্ক শ্রমিকের চেয়ে শিশু শ্রমিকদের মুজুরী একেবারে কম। কাজ কিছুটা কম করলেও বড়দের সাথে সমান তালে তাদেরকে দিনের পুরো সময়টাই কাজ করতে হয়। শ্রম মূল্য কম হওয়ায় ভাটা মালিকরা আইনের তোয়াক্কা না করে এসব শিশু শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাচ্ছে। ভাটায় ইট পোড়ানোর সময় নির্গত দুর্গন্ধ, দুষিত বায়ু এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে এসব শিশুদের মানষিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জটিল রোগাক্রান্ত হচ্ছে তারা। আর পড়ালেখা না করতে পারায় নিরক্ষরতা থেকে যাচ্ছে তারা।

একজন ভাটা মালিক বলেন, সব ক্ষেত্রে শিশু শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে, তাই তারাও ভাটায় শিশুদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন।

লক্ষ্মীপুরের কর্মরত গণমাধ্যমকর্মী মীর ফরহাদ হোসেন সুমনের মতে, ইটভাটার মতো অস্বাস্থ্যকর এবং কঠিন পরিবেশে শিশুশ্রম বন্ধে প্রথমে পরিবারকে সচেতন হতে হবে। আর শিশুশ্রম বন্ধে সরকারের আইন প্রয়োগে স্থানীয় প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। আইন অমান্যকারী অসাধু ভাটা মালিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিলে শিশুশ্রম কমে আসবে। এছাড়া ওইসব শিশুদের বেড়ে উঠতে এবং লেখাপড়া করার সুযোগ করে দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

এ বিষয়ে চাইল্ড এন্ড উইমেন ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী পরিচালক পারভিন হালিম বলেন, লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিশুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝঁকিপূর্ণ হলো হোটেল, কলকারখানা, ইটভাটা এবং অটোরিক্সা চালনা। পরিবারের সচেতনতার অভাবে কিংবা আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ সেক্টরে কাজ করে। এক্ষেত্রে আমরা পরিবারকে সচেতনতার চেষ্টা করি।

তিনি বলেন, ইটভাটায় যেসব শিশু কাজ করে তাদের জীবন শঙ্কার মধ্যে থাকে। ওইসব প্রতিষ্ঠানের উচিত শিশুদের কাজের পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তা না হলে এসব শিশুরা মানষিক এবং শারীরিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যত। একটি শিশু তার পরিবারের শাসন এবং যতœ নিয়ে বেড়ে না উঠলে ভবিষ্যৎ এখানেই থেমে যাবে। তাদেরকে দিয়ে ভালো কিছু আশা করা যায়না।

তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা দেশি-বিদেশী আর্থিক অনুদান নিয়ে শিশুদের জন্য কাজ করছে- তাদেরকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বরাদ্দকৃত অর্থ শিশুদের মান উন্নয়নের ব্যয় করা হলে শিশুশ্রম কমে আসবে। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে শিশুদেরকে নিয়ে পরিসংখ্যান করা হলে তখন একটা হিসেব থাকবে- কতজন শিশু প্রতি বছর ঝরে পড়তেছে। বলেন- এ বিষয়ে প্রশাসনকে আরও আন্তরিক এবং দায়িত্বশীল হতে হবে।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম বলেন, আমরা যখন অবৈধ ইটভাটায় অভিযান চালাই, তখন ওই সব ভাটাতে শিশু শ্রমিক থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ভাটা মালিকদের সতর্ক করে দিই।

Spread the love

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ



Design & Developed by Md Abdur Rashid, Mobile: 01720541362, Email:arashid882003@gmail.com